ভূমিকা: রাজনীতির মাঠে ধর্মের অকালবোধন
কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড মানেই সাধারণত রাজনৈতিক সভার ভিড়, নেতাদের গর্জন আর পতাকার রং বদল। কিন্তু রবিবার ব্রিগেড দেখল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। রাজনীতির স্লোগান নয়, ব্রিগেডের আকাশ-বাতাস মুখরিত হলো পবিত্র ভগবদ গীতার শ্লোকে। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং 'জয় শ্রী রাম' ধ্বনিতে কেঁপে উঠল তিলোত্তমা।
লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে আয়োজিত এই 'লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ' অনুষ্ঠানটি শুধু ধর্মীয় আচার ছিল না, এটি ছিল সনাতন সংস্কৃতির এক বিশাল পুনজাগরণ। আর এই আধ্যাত্মিক মহাযজ্ঞে বাড়তি উন্মাদনা যোগ করেছিলেন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা, বাগেশ্বর ধামের পীঠাধীশ্বর ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি ভক্তদের কাছে 'বাগেশ্বর বাবা' নামেই বেশি পরিচিত।
এক নজরে ঐতিহাসিক গীতাপাঠের মুহূর্ত
সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন ময়দানে। সাধু-সন্ত থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ—সবার পরনে ছিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক। পুরুষদের পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি আর মহিলাদের পরনে লাল-পাড় শাড়ি।
ঠিক যখন সমবেত কণ্ঠে গীতার পাঁচটি অধ্যায় পাঠ শুরু হলো, তখন এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি হয়। শঙ্খের আওয়াজ আর এক লক্ষেরও বেশি মানুষের সংস্কৃত উচ্চারণ এক অদ্ভুত স্পন্দন সৃষ্টি করেছিল। আয়োজকদের মতে, এটি শুধু একটি রেকর্ড গড়ার প্রচেষ্টা ছিল না, বরং সমাজকে একসূত্রে বাঁধার একটি বার্তা ছিল।
মঞ্চে বাগেশ্বর বাবা: ভক্তদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস
এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর থেকে আগত তরুণ ধর্মগুরু ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বা বাগেশ্বর বাবা। তিনি মঞ্চে প্রবেশ করা মাত্রই জনসমুদ্রের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো।
বাগেশ্বর বাবা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভক্তদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন এবং আশীর্বাদ জানান। তাঁর বক্তৃতায় তিনি বলেন, "বাংলার মাটি পবিত্র। এটি চৈতন্য মহাপ্রভুর ভূমি, রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং স্বামী বিবেকানন্দের ভূমি। আজ এখানে এত মানুষকে গীতা পাঠ করতে দেখে আমি অভিভূত।"
তিনি আরও বলেন, "বাঙালিরা যখন জাগে, তখন পুরো ভারত জাগে। সনাতন ধর্মকে রক্ষা করতে এবং একজোট থাকতে এই ধরনের আয়োজনের প্রয়োজন আছে।" তাঁর প্রতিটি কথায় উপস্থিত জনতা করতালিতে ফেটে পড়ে। বাগেশ্বর বাবা এদিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও হিন্দু ঐক্যের ওপর জোর দেন, যা তাঁর অনুগামীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
সংস্কৃতি নাকি মেরুকরণ?
ব্রিগেডের এই গীতাপাঠ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা থাকলেও, আয়োজকরা একে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক বলে দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, গীতা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি মানবতার গ্রন্থ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যা আয়োজকদের উৎসাহ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি ছিল এক মিলনমেলা। রোজকার ব্যস্ত জীবনের বাইরে এসে, খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার অপরিচিত মানুষের সাথে বসে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার যে আনন্দ, তা ছিল এই অনুষ্ঠানের আসল প্রাপ্তি।
উপসংহার: ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায়
ব্রিগেডের মাঠে লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ প্রমাণ করে দিল যে, কলকাতা শুধু মিছিল আর মিটিংয়ের শহর নয়, এটি ভক্তি ও ভাবেরও শহর। বাগেশ্বর বাবার উপস্থিতি এবং লক্ষাধিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই দিনটিকে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখল।
আগামী দিনে এই ধরনের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাংলার সমাজজীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে রবিবারের ব্রিগেড নিঃসন্দেহে বুঝিয়ে দিল—ধর্মীয় ভাবাবেগেও মানুষ একজোট হতে পারে, যেখানে ভেদাভেদের কোনো স্থান নেই।
Tags: লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড, বাগেশ্বর বাবা কলকাতা, ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী, সনাতন ধর্ম সম্মেলন, Kolkata Brigade Geeta Path, Bageshwar Baba in Kolkata, Laksha Kanthe Geeta Path, West Bengal News
