আনন্দ 24/7

বাংলা খবর, প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল এবং ভাইরাল ট্রেন্ডস-এর এক নম্বর ঠিকানা আনন্দ 24/7। খবর যখনই, আমরা তখনই।

কলকাতার বুকেই শুয়ে আছে ৪০০০ বছরের ইতিহাস! মিশরের মমি থেকে ডাইনোসর—এশিয়ার প্রাচীনতম জাদুঘর নিয়ে কেন গর্ব করবেন বাঙালিরা?

Admin |

ভূমিকা: চেনা শহরের অচেনা গর্ব

​কলকাতা মানেই কি শুধু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ আর ট্রাম? আমরা যারা কলকাতায় থাকি বা কলকাতাকে ভালোবাসি, তারা গর্ব করে বলি—"কলকাতা সংস্কৃতির শহর"। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, আমাদের এই শহরের বুকেই এমন এক সম্পদ লুকিয়ে আছে, যা বয়সে যিশু খ্রিস্টের জন্মের চেয়েও হাজার বছরের বড়! আমাদের ছোটবেলার স্কুল এক্সকারশনের সেই চেনা গন্তব্য—'জাদুঘর' বা ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম (Indian Museum)

কলকাতার বুকেই শুয়ে আছে ৪০০০ বছরের পুরনো মমি! এশিয়ার প্রাচীনতম জাদুঘর ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের ইতিহাস ও ড. ওয়ালিচের অবদান জানুন। গর্বিত হবে সব বাঙালি!

​সম্প্রতি একটি ভিডিওতে এই জাদুঘর নিয়ে এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে যা শুনে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্তম্ভিত। প্যারিসের লুভ্যর মিউজিয়াম বা লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম নিয়ে আমরা কত চর্চা করি, অথচ এশিয়ার প্রাচীনতম এবং বিশ্বের নবম প্রাচীনতম জাদুঘরটি যে আমাদের জওহরলাল নেহেরু রোডে (চৌরঙ্গী) দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে আমরা কতটা গর্ব করি? আজকের ব্লগে আমরা ধুলো ঝেড়ে বের করব সেই ৪০০০ বছরের পুরনো ইতিহাসকে।

কলকাতার জওহরলাল নেহেরু রোডে অবস্থিত সাদা রঙের বিশাল ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম বা জাদুঘর ভবন, যা এশিয়ার প্রাচীনতম জাদুঘর।

১৮১৪ সাল: এক ড্যানিশ স্বপ্নদ্রষ্টার হাত ধরে পথচলা

​ইতিহাসের পাতা উল্টে ফিরে যাওয়া যাক ১৮১৪ সালে। ব্রিটিশ শাসিত ভারত। সেই সময় এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলের উদ্যোগে এই জাদুঘরের জন্ম। কিন্তু এর পেছনে মূল মস্তিষ্কটি কোনো বাঙালির বা ব্রিটিশের ছিল না, ছিলেন একজন ড্যানিশ উদ্ভিদবিদ—ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচ (Dr. Nathaniel Wallich)

জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিশ উদ্ভিদবিদ ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচের একটি ঐতিহাসিক প্রতিকৃতি বা স্কেচ।

​ভিডিওটিতেও তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়েছে। ড. ওয়ালিচ চেয়েছিলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে, যা শুধু ভারতের নয়, সমগ্র এশিয়ার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হবে। তিনি নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহের প্রচুর বোটানিক্যাল নমুনা দান করে এর সূচনা করেন। তাঁর সেই স্বপ্ন আজ মহীরুহে পরিণত। আজ এটি "Largest and Oldest Museum in the Asia-Pacific Region"। ভাবুন তো, ১৮১৪ সালে যখন বিশ্বের অনেক দেশ আধুনিকতার আলো দেখেনি, তখন কলকাতায় গড়ে উঠছিল এমন এক আন্তর্জাতিক মানের সংগ্রহশালা!

ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের প্রধান আকর্ষণ ৪০০০ বছরের পুরনো মিশরীয় মমি, যা একটি কাঁচের বাক্সে বিশেষ তাপমাত্রায় সংরক্ষিত আছে।

মিশরীয় মমি: নীল নদের তীর থেকে গঙ্গার পাড়ে

​ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের সবথেকে বড় আকর্ষণ এবং সবথেকে বড় রহস্য হলো এর 'ইজিপশিয়ান গ্যালারি'-তে রাখা মমিটি। কাঁচের বাক্সে শুয়ে থাকা এই মানুষটি কে? কীভাবে এল সে কলকাতায়?

​ইতিহাস বলছে, এই মমিটি প্রায় ৪০০০ বছরের পুরনো। ১৮৩৪ সালে ব্রিটিশ অফিসার লেফটেন্যান্ট ই.সি. আর্চবোল্ড (Lt. E.C. Archbold) এশিয়াটিক সোসাইটিকে এটি উপহার হিসেবে দেন। তিনি এটি মিশরের নীল নদের পশ্চিম তীরের 'গোরনা' (Gourva/Gourna) নামক রাজকীয় সমাধি ক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।

আরও পড়ুন: ভারতের পূর্বে থেকেও কেন এর নাম 'পশ্চিমবঙ্গ'? পাহাড় থেকে সমুদ্র—এক নজরে আমাদের চেনা রাজ্যের অজানা ভূগোল!

​কিন্তু এর ভারতে আসার গল্পটা সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর। শোনা যায়, যখন জাহাজে করে মমিটিকে কলকাতায় আনা হচ্ছিল, তখন জাহাজের নাবিকরা ভয়ে অস্থির হয়ে পড়েছিল। কুসংস্কার ছিল যে, মমির সাথে 'অভিশাপ' বা প্রেতাত্মা থাকে, যা মাঝসমুদ্রে জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে! অনেক বুঝিয়ে তাদের শান্ত করা হয়। প্রথমে দীর্ঘকাল মনে করা হতো এটি কোনো নারীর মমি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায়, এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যানের পর জানা গেছে—এটি আসলে ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী এক পুরুষের মমি। তার শরীরের হাড় এবং গঠন পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, প্রাচীন মিশরের কোনো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি। আজ ৪০০০ বছর পর, মিশরের পিরামিডের অন্ধকার ছেড়ে তিনি শুয়ে আছেন কলকাতার ব্যস্ততম রাস্তার পাশে, কাঁচের ঘেরাটোপে।

জাদুঘরের ভারহুত গ্যালারিতে সংরক্ষিত প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপের রেলিং এবং তোরণের ওপর খোদাই করা সূক্ষ্ম কারুকার্য।

কেন এর নাম 'জাদুঘর'?

​ছোটবেলায় ভাবতাম এখানে হয়তো জাদুকরদের খেলা দেখানো হয়, তাই এর নাম জাদুঘর। কিন্তু আসল কারণটি বেশ মজার। ব্রিটিশ আমলে যখন সাধারণ মানুষ প্রথমবার এই মিউজিয়ামে অদ্ভুত সব সংরক্ষিত প্রাণী, কঙ্কাল এবং মমি দেখতে শুরু করে, তখন তাদের কাছে এটি 'জাদু' বা অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল। সেই থেকেই লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় 'জাদুঘর' বা 'Magic House'।

শুধু মমি নয়, ইতিহাসের এক বিশাল ভাণ্ডার

​ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে ঢুকলে আপনি যেন টাইম মেশিনে চড়ে বসবেন। মমির গ্যালারি ছাড়াও এখানে দেখার মতো আরও অনেক কিছু আছে যা আমাদের গর্বিত করে:

​১. ভারহুত গ্যালারি (Bharhut Gallery): মধ্যপ্রদেশের ভারহুত থেকে উদ্ধার করা বৌদ্ধ স্তূপের রেলিং এবং তোরণ এখানে সংরক্ষিত আছে। বেলেপাথরের ওপর খোদাই করা যক্ষ-যক্ষিণী এবং জাতকের গল্পগুলো প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

২. ডাইনোসরের রাজত্ব: ন্যাচারাল হিস্ট্রি সেকশনে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের কঙ্কাল দেখে শিশুরা আজও অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। বিশাল ডাইনোসরের ফসিল মনে করিয়ে দেয়, মানুষের আগেও এই পৃথিবীতে অন্য কেউ রাজত্ব করত।

৩. অশোক স্তম্ভ ও মুদ্রা: আমাদের জাতীয় প্রতীকের মূল অনুপ্রেরণা সারনাথের অশোক স্তম্ভের একটি অনুলিপি এবং গুপ্ত, কুষাণ ও মুঘল যুগের স্বর্ণমুদ্রা ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এখানে জ্বলজ্বল করছে।

৪. উল্কপিণ্ড: মহাকাশ থেকে খসে পড়া সত্যিকারের উল্কপিণ্ড বা মেটিওরাইটও এখানে রাখা আছে, যা মহাজাগতিক বিস্ময়।

রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ ও গর্ব

​এত বিশাল এবং প্রাচীন সংগ্রহশালা রক্ষণাবেক্ষণ করা মুখের কথা নয়। কিছুদিন আগেই মমির সংরক্ষণ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের আর্দ্র আবহাওয়া মমির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু খুশির খবর হলো, এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে কাঁচের বাক্সের ভেতর তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ (Climate Control) করা হচ্ছে। ব্যবহার করা হচ্ছে নাইট্রোজেন বক্স, যাতে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস মমিটিকে নষ্ট করতে না পারে। আমাদের এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার এই বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাও গর্ব করার মতো।

ন্যাচারাল হিস্ট্রি সেকশনে রাখা বিশাল ডাইনোসরের কঙ্কাল এবং প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের ফসিল, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

আমার বক্তব্য (My Perspective)

(একজন সচেতন নাগরিক এবং ইতিহাসপ্রেমী হিসেবে কিছু কথা)

​ভিডিওটি দেখার পর আমার মনে হলো, আমরা বাঙালিরা প্রায়শই নিজেদের সম্পদকে অবহেলা করি। আমরা লন্ডনের মাদাম তুসো বা কায়রোর মিউজিয়াম দেখার স্বপ্ন দেখি, অথচ ছুটির দিনে ভিক্টোরিয়ায় ভিড় করলেও, জাদুঘরের ওই শান্ত করিডোরগুলোতে আমাদের পায়ের ধুলো কম পড়ে।

​আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি একটি 'শিক্ষার মন্দির'। আজকের স্মার্টফোনের যুগে বাচ্চারা যখন রিলস দেখতে ব্যস্ত, তখন তাদের হাত ধরে এখানে নিয়ে আসা উচিত। তাদের দেখানো উচিত ৪০০০ বছর আগের মানুষের জীবনযাত্রা, ডাইনোসরের কঙ্কাল বা বৌদ্ধ যুগের শিল্পকলা। এটি তাদের কল্পাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে।

​তবে কর্তৃপক্ষের কাছে আমার একটি বিনীত অনুরোধ থাকবে—গ্যালারিগুলোর লাইটিং এবং প্রেজেন্টেশন আরও আধুনিক করা হোক। বিদেশের মিউজিয়ামগুলোতে যেমন অডিও গাইড বা ইন্টার‍্যাক্টিভ ডিসপ্লে থাকে, তেমন ব্যবস্থা থাকলে নতুন প্রজন্ম আরও বেশি আগ্রহী হবে। আমাদের মমিটি বিশ্বের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত মমি, একে কেন্দ্র করে আরও ভালো প্রচার বা 'টুরিজম ক্যাম্পেইন' করা যেতে পারে।

​পরিশেষে বলব, এই জাদুঘর আমাদের 'আইডেন্টিটি' বা পরিচয়ের অংশ। ১৮১৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এটি দাঁড়িয়ে আছে মহাকালের সাক্ষী হয়ে। আসুন, আমরা আমাদের এই গর্বকে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, বাস্তবেও আপন করে নিই।

ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের ভিতরের দীর্ঘ এবং প্রশস্ত করিডোর, যার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে প্রাচীন মূর্তি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সাজানো রয়েছে।

উপসংহার

​"ইতিহাস কথা কয়"—এই প্রবাদটি যদি বাস্তবে অনুভব করতে চান, তবে আপনাকে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে আসতেই হবে। ৪০০০ বছরের পুরনো সেই মিশরীয় মানুষটি হয়তো কাঁচের ওপাশ থেকে আমাদের দেখছে আর ভাবছে, সময় কীভাবে বদলে যায়! কলকাতার বুকে এই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞান ও বিজ্ঞানে বাংলা একসময় বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল।

​তাই পরের বার যখন পার্ক স্ট্রিট দিয়ে হাঁটবেন, একবারের জন্য হলেও ওই বিশাল সাদা বাড়িটির দিকে তাকাবেন এবং মনে মনে বলবেন—"হ্যাঁ, এটাই আমাদের গর্ব, আমাদের জাদুঘর।"

আরও পড়ুন: সাবধান! বন্ধু বা আত্মীয়ের থেকে ২০ হাজার টাকার বেশি ধার নিচ্ছেন? নগদে লেনদেন করলেই ১০০% জরিমানা! জানুন বাঁচার উপায়


Tags: Indian Museum Kolkata, Egyptian Mummy Kolkata, History of Kolkata, Dr Nathaniel Wallich, Asia's Oldest Museum, জাদুঘর, Kolkata Tourism, 4000 Year Old Mummy, Bengali Culture.