ভূমিকা: সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে বড় সিদ্ধান্ত
তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমানো এবং জাতীয় রাজস্ব আদায়ে ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্যে ভারতের সংসদে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের শীতকালীন অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করেছিলেন, যা লোকসভা এবং রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই পাস হয়ে গেছে।
এই নতুন বিল দুটির নাম হলো 'সেন্ট্রাল এক্সাইজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৫' এবং 'হেলথ সিকিউরিটি সে ন্যাশনাল সিকিউরিটি সেস বিল, ২০২৫'। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই নতুন নিয়মের ফলে কি সিগারেট, বিড়ি বা পান মশলার দাম আরও বাড়বে? নাকি জিএসটি সেস উঠে যাওয়ায় দাম কমবে? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা সংসদের এই নতুন নিয়ম এবং আপনার পকেটে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. নতুন বিলের মূল উদ্দেশ্য কী?
এতদিন পর্যন্ত সিগারেট এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ওপর ২৮% জিএসটি (GST)-এর পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত 'কম্পেনসেশন সেস' (Compensation Cess) বা ক্ষতিপূরণ সেস বসানো হতো।
সরকারের আশঙ্কা ছিল, যদি এই সেস উঠে যায়, তবে তামাকজাত পণ্যের দাম হঠাৎ করে অনেকটা কমে যেতে পারে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং সরকারও রাজস্ব হারাবে। তাই এই 'কম্পেনসেশন সেস'-এর পরিবর্তে এখন থেকে সরাসরি 'সেন্ট্রাল এক্সাইজ ডিউটি' (Central Excise Duty) বা কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক বসানো হবে।
২. সিগারেটের ওপর নতুন করের হার (New Tax Rates)
সংসদে পাস হওয়া 'সেন্ট্রাল এক্সাইজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৫' অনুযায়ী, সিগারেটের ওপর আবগারি শুল্কের নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাধারণ সিগারেট ও ফিল্টার: প্রতি ১,০০০ শলাকা সিগারেটের ওপর ২,৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ১১,০০০ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক বসানো হতে পারে।
সিগার ও চেরুট: এর ওপর ২৫% অথবা প্রতি ১,০০০ শলাকায় ৫,০০০ টাকা—যেটি বেশি হবে, সেই হারে কর নেওয়া হবে।
কাঁচা তামাক (Unmanufactured Tobacco): এর ওপর ৬০% থেকে ৭০% আবগারি শুল্ক বসানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
চিবানোর তামাক (Chewing Tobacco): প্রতি কেজিতে ১০০ টাকা হারে কর বসবে।
অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মানদণ্ড অনুযায়ী তামাকজাত পণ্যের ওপর করের হার এমনভাবে রাখা উচিত যাতে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। এই নতুন বিল সেই লক্ষ্যেই আনা হয়েছে।
৩. পান মশলার জন্য নতুন 'হেলথ সিকিউরিটি সেস'
শুধুমাত্র সিগারেট নয়, পান মশলা এবং গুটখা জাতীয় পণ্যের জন্যও একটি আলাদা বিল পাস হয়েছে—'হেলথ সিকিউরিটি সে ন্যাশনাল সিকিউরিটি সেস বিল, ২০২৫'।
নতুন সেস কেন? এই নতুন সেস বা উপকর থেকে আদায় করা অর্থ সরাসরি দুটি খাতে ব্যবহার করা হবে: জনস্বাস্থ্য (Public Health) এবং জাতীয় নিরাপত্তা (National Security)। অর্থাৎ, তামাক খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়, তার চিকিৎসার খরচ এবং দেশের সুরক্ষার জন্য এই টাকা ব্যয় হবে।
উৎপাদনের ওপর কর: আগে বিক্রির ওপর ভিত্তি করে কর নেওয়া হতো, যার ফলে অনেক কোম্পানি কর ফাঁকি দিত।
কিন্তু নতুন নিয়মে পান মশলা তৈরির মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কর ধার্য করা হতে পারে। এতে কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হবে।
৪. সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব কী?
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, "আমার কি এখন বেশি টাকা খরচ করতে হবে?"
সরকারের মূল লক্ষ্য হলো, জিএসটি সেস উঠে যাওয়ার পর যেন তামাকজাত পণ্যের দাম না কমে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সংসদে জানিয়েছেন যে, তামাকজাত পণ্যকে 'সিন গুডস' (Sin Goods) বা ক্ষতিকর পণ্যের তালিকায় রাখা হয়েছে এবং এর ওপর সর্বোচ্চ কর (৪০% পর্যন্ত) বজায় রাখা হবে।
সুতরাং, দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং নতুন আবগারি শুল্ক এবং নতুন সেস যুক্ত হওয়ার ফলে কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন খরচ মেটাতে পণ্যের দাম সামান্য বাড়াতেও পারে। অর্থাৎ, ধূমপায়ীদের পকেটে চাপ বজায় থাকছেই।
৫. বিরোধীদের উদ্বেগ ও সরকারের আশ্বাস
সংসদে বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় বিরোধী দলের সাংসদরা তামাক চাষি এবং বিড়ি শ্রমিকদের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত করের চাপে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এর উত্তরে সরকার জানিয়েছে:
তামাক চাষিদের বিকল্প চাষে (যেমন ভুট্টা, ডাল বা অন্যান্য অর্থকরী ফসল) উৎসাহিত করা হচ্ছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক একর জমিতে তামাকের বদলে অন্য ফসল চাষ শুরু হয়েছে।
বিড়ি শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কল্যাণমূলক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে যাতে তাঁরা তামাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন।
৬. চিকিৎসা ও জাতীয় সুরক্ষায় অবদান
এই বিলের একটি ইতিবাচক দিক হলো এর অর্থের ব্যবহার। তামাকজাত পণ্য থেকে যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে, তা সরাসরি এইমস (AIIMS)-এর মতো হাসপাতাল তৈরি, ক্যানসার গবেষণা এবং দেশের সীমান্তে সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণে ব্যয় হবে। সরকার স্লোগান দিয়েছে—"স্বাস্থ্য সুরক্ষা সে জাতীয় সুরক্ষা" (Health Security se National Security)।
উপসংহার: এক নতুন অধ্যায়
সংসদে পাস হওয়া এই বিলগুলি প্রমাণ করে যে, ভারত সরকার তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। একদিকে যেমন এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলজনক, অন্যদিকে এটি দেশের রাজস্ব আদায়ে স্থিতিশীলতা আনবে। ধূমপায়ীদের জন্য এটি দুঃসংবাদ হলেও, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এটি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আপনার কি মনে হয় এই নতুন নিয়মে তামাকের ব্যবহার কমবে? নাকি মানুষ বেশি দাম দিয়েই নেশা চালিয়ে যাবে? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানান।
Tags: New Rules for Cigarettes in India 2025, Parliament Winter Session Tobacco Bill, Central Excise Amendment Bill 2025, Health Security se National Security Cess, তামাক নিয়ন্ত্রণ বিল ২০২৫,
