ভূমিকা: বিমানঘাঁটিতে এক নজিরবিহীন দৃশ্য
দিল্লির আকাশে তখন পড়ন্ত বিকেল। পালাম এয়ারফোর্স স্টেশনের ভিভিআইপি টার্মিনালে নিরাপত্তা তখন সর্বোচ্চ শিখরে। সাধারণত যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান ভারতে আসেন, তখন প্রথা বা 'প্রোটোকল' অনুযায়ী তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকেন কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বা সিনিয়র আমলা। প্রধানমন্ত্রী নিজে বিমানবন্দরে যান—এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু আজ চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিমান যখন মাটি স্পর্শ করল, তখন রানওয়েতে দাঁড়িয়ে খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সমস্ত প্রথাগত নিয়মকানুন বা 'প্রোটোকল' একপাশে সরিয়ে রেখে, বন্ধুকে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেলেন তিনি। এই একটি দৃশ্যই বুঝিয়ে দিল, ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক কেবল দুটি দেশের কূটনৈতিক কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি তার চেয়েও অনেক গভীর এবং ব্যক্তিগত।
প্রোটোকল কেন ভাঙলেন প্রধানমন্ত্রী?
কূটনীতির ভাষায় 'বডি ল্যাঙ্গুয়েজ' বা শরীরী ভাষা অনেক কথা বলে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এর আগেও বারাক ওবামা বা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য প্রোটোকল ভেঙেছেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে পুতিনের জন্য এই প্রোটোকল ভাঙার তাৎপর্য অনেক বেশি।
১. ব্যক্তিগত রসায়ন: নরেন্দ্র মোদী এবং ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশ্ব রাজনীতিতে এই দুই নেতা একে অপরকে 'ঘনিষ্ঠ বন্ধু' বলে সম্বোধন করেন। প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়া সেই বন্ধুত্বেরই এক জনসমক্ষ স্বীকৃতি।
২. বিশ্বকে কড়া বার্তা: ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা বিশ্বের নানা নিষেধাজ্ঞার মাঝেও ভারত যে রাশিয়ার পাশে আছে, বা বলা ভালো—ভারত যে তার নিজের জাতীয় স্বার্থ এবং পুরোনো বন্ধুর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে স্বাধীন, এই ঘটনাটি ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন পর্যন্ত সেই বার্তাই পৌঁছে দিল।
'গ্র্যান্ড ওয়েলকাম': রাজকীয় অভ্যর্থনার খুঁটিনাটি
পুতিন বিমান থেকে নামার সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁকে উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেন। এই আলিঙ্গন বা 'হাগ ডিপ্লোমেসি' মোদীর নিজস্ব স্টাইল হলেও, আজ তাতে আবেগের মাত্রা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিমানবন্দরেই আয়োজন করা হয়েছিল এক সংক্ষিপ্ত অথচ জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ভারতের ঐতিহ্যবাহী নাচ এবং বাদ্যযন্ত্রের সুরে রুশ প্রেসিডেন্টকে বরণ করে নেওয়া হয়। সাধারণত এই ধরনের আয়োজন রাষ্ট্রপতি ভবনের জন্য তোলা থাকে, কিন্তু বিমানবন্দরেই এমন অভ্যর্থনা বুঝিয়ে দেয়, ভারত এই সফরকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। পুতিনের মুখেও দেখা গেছে চওড়া হাসি, যা সচরাচর তাঁর ভাবলেশহীন মুখে দেখা যায় না।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক: সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
কেন এই এত আয়োজন? কেন এই প্রোটোকল ভাঙা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের জ্বালানি সংকট—প্রতিটি কঠিন সময়ে রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) ভারতের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই সফরের গুরুত্ব অপরিসীম:
- প্রতিরক্ষা সহযোগিতা: ভারত আজও তার সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এস-৪০০ মিসাইল সিস্টেম থেকে শুরু করে একে-২০৩ রাইফেল—সবক্ষেত্রেই রাশিয়া ভারতের প্রধান জোগানদাতা।
- জ্বালানি নিরাপত্তা: বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন রাশিয়া থেকে ছাড়ে তেল কিনে ভারত তার অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
- কৌশলগত অংশীদারিত্ব: এশিয়া মহাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে রাশিয়ার সাথে ভারতের সুসম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি।
পশ্চিমী বিশ্বের ভ্রুকুটি ও ভারতের অবস্থান
স্বাভাবিকভাবেই, মোদীর এই 'গ্র্যান্ড ওয়েলকাম' পশ্চিমা মিডিয়া এবং রাষ্ট্রনেতাদের ভ্রু কুঁচকে দিয়েছে। আমেরিকা এবং ইউরোপ যেখানে পুতিনকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন—এই দৃশ্য তাদের অস্বস্তির কারণ।
কিন্তু ভারত তার অবস্থানে অটল। ভারতের বিদেশনীতি এখন আর 'জোটনিরপেক্ষ' থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' বা Strategic Autonomy-র যুগে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, ভারত আমেরিকার সাথেও বন্ধুত্ব রাখবে, আবার রাশিয়ার সাথেও পুরোনো সম্পর্ক ঝালিয়ে নেবে—এবং সেটা করবে সম্পূর্ণ নিজের শর্তে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই প্রোটোকল ভাঙা সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতীক।
এই সফর থেকে কী আশা করা যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরে বেশ কিছু বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
- প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ উৎপাদন (Make in India-র আওতায়)।
- পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রে নতুন রিঅ্যাক্টর স্থাপন।
- মহাকাশ গবেষণা বা গগনযান মিশনে রাশিয়ার সহায়তা।
- টাকা-রুবল বাণিজ্যের নতুন রূপরেখা।
উপসংহার: বন্ধুত্বের জয়গান
রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু হয় না, থাকে শুধু স্থায়ী স্বার্থ। কিন্তু ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই কথাটি হয়তো পুরোপুরি খাটে না। এখানে স্বার্থের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক দীর্ঘলূমি বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে পুতিনের হাত ধরলেন, তখন তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনেতাকে স্বাগত জানালেন না, তিনি ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে বার্তা দিলেন—"সময়ের চাকা যেদিকেই ঘুরুক, ভারত তার পরীক্ষিত বন্ধুদের ভুলে যায় না।"
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এই সফর এবং মোদীর এই রাজকীয় অভ্যর্থনা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির দাবা বোর্ডে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আপনার মতামত কী?
প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই প্রোটোকল ভেঙে পুতিনকে স্বাগত জানানোকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এটি কি ভারতের জন্য লাভজনক, নাকি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে? কমেন্ট করে আমাদের জানান।
Tags: নরেন্দ্র মোদী ও ভ্লাদিমির পুতিন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক, মোদী প্রোটোকল ভাঙলেন, পুতিনের গ্র্যান্ড ওয়েলকাম,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ, India-Russia Summit,Modi welcomes Putin at airport, PM Modi breaks protocol
