ভূমিকা
নয়াদিল্লির রাজপথে যখন ভ্লাদিমির পুতিনের কনভয় যাবে, তখন বিশ্বের বেশিরভাগ প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রনায়কদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। দৃশ্যটি বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। একদিকে, ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন এবং শিশুদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের মতো গুরুতর অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) যার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, সেই তিনি—ভ্লাদিমির পুতিন—বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে পা রাখছেন রাজকীয় অতিথি হিসেবে।
পশ্চিমী বিশ্ব যখন পুতিনকে একঘরে করে রেখেছে, তখন ভারতে তাঁর এই 'নির্ভয়' সফর অনেকগুলো কঠিন প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। একজন ঘোষিত 'যুদ্ধাপরাধী' (পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে) কীভাবে ভারতে এত নিশ্চিন্তে সফর করতে পারেন? এর পেছনে কি শুধুই বন্ধুত্ব, নাকি লুকিয়ে আছে গভীর কোনো কৌশলগত স্বার্থের খেলা? আসুন, আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে এই সফরের পেছনের বাস্তব কারণগুলো বিশ্লেষণ করি।
আন্তর্জাতিক পরোয়ানা এবং ভারতের আইনি অবস্থান
সবার আগে আইনি দিকটি পরিষ্কার করা যাক। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগ—ইউক্রেন থেকে শিশুদের বেআইনিভাবে রাশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া, যা একটি যুদ্ধাপরাধ। এই পরোয়ানার কারণেই পুতিন আইসিসি-র সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে (যেমন গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকস সম্মেলনে) সফর এড়িয়ে চলেন, কারণ সেই দেশগুলো তাকে গ্রেফতার করতে আইনত বাধ্য।
কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সমীকরণটি ভিন্ন। ভারত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি (Rome Statute)-তে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। সহজ কথায়, আইসিসি-র কোনো পরোয়ানা কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা ভারতের নেই। এটি পুতিনকে ভারতে আসার একটি বড় আইনি রক্ষাকবচ প্রদান করে। ভারত বরাবরই আইসিসি-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এসেছে এবং মনে করে যে, এগুলো অনেক সময় পশ্চিমী দেশগুলোর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বন্ধুত্বের চেয়েও বড় যখন 'জাতীয় স্বার্থ'
তবে কি শুধুই আইনি ফাঁকফোকর পুতিনের এই সফরের কারণ? একদমই না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আবেগের জায়গায় চলে না, এটি চলে নির্মম বাস্তববাদ এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে। ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব ভারতের পাশে ছিল না, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ভারতের পরীক্ষিত বন্ধু। কাশ্মীর ইস্যু হোক বা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা ভারতকে বহুবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে রক্ষা করেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই স্বার্থের জায়গাটি আরও জোরালো হয়েছে:
১. প্রতিরক্ষা নির্ভরতা: ভারতের সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড আজও অনেকাংশে রুশ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সুখোই যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, এমনকি সাবমেরিন—ভারতের প্রতিরক্ষার জন্য রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। রাতারাতি এই নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
২. জ্বালানি নিরাপত্তা (সস্তায় তেল): ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী, তখন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কিনেছে। এটি ভারতের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে বাঁচিয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছে। দেশের মানুষের স্বার্থে সরকারের এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।
৩. চীন ফ্যাক্টর এবং ভূ-রাজনীতি: এটি সম্ভবত সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়া ক্রমশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। হিমালয় সীমান্তে চীনের সাথে ভারতের যে বৈরিতা চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া পুরোপুরি চীনের বলয়ে চলে যাক, এটা ভারত কখনোই চাইবে না। রাশিয়াকে কিছুটা হলেও নিরপেক্ষ রাখা বা চীনের একক প্রভাব থেকে দূরে রাখা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পুতিনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সেই কৌশলেরই অংশ।
ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য
ভারত খুব সাবধানে এক কূটনৈতিক দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে। একদিকে আমেরিকা ও ইউরোপের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা, অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পুতিনকে সরাসরি বলেছিলেন, "আজকের যুগ যুদ্ধের যুগ নয়।" এটি ছিল পশ্চিমের প্রতি ভারতের বার্তা যে, তারা যুদ্ধের পক্ষে নয়। কিন্তু একই সাথে ভারত জাতিসংঘে কখনোই রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি ভোট দেয়নি।
এই 'কৌশলগত নিরপেক্ষতা' (Strategic Autonomy) ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। ভারত কোনো নির্দিষ্ট শিবিরের অংশ হতে রাজি নয়, বরং নিজের শর্তে বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়।
উপসংহার
ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফর প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতা এবং স্বার্থের সমীকরণ অনেক বেশি শক্তিশালী। গণহত্যার অভিযোগ বা আন্তর্জাতিক পরোয়ানা—সবকিছুই গৌণ হয়ে যায় যখন দুটি দেশের পারস্পরিক স্বার্থ এক বিন্দুতে মিলে যায়।
পশ্চিমা বিশ্ব হয়তো এই সফরে ভ্রু কুঁচকাবে, কিন্তু নয়াদিল্লি জানে, ১৪০ কোটি মানুষের দেশের স্বার্থরক্ষা করা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুতিনের এই 'নির্ভয়' সফর আসলে ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিরই এক সাহসী বহিঃপ্রকাশ, যেখানে দেশটি নিজের জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছে।
আপনার কী মনে হয়? ভারতের এই অবস্থান কি সঠিক, নাকি আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা উচিত ছিল? কমেন্টে আপনার মতামত জানান।
Tags: Vladimir Putin India Visit, Putin Arrest Warrant, India Russia Relations, ICC Warrant Explained, ভ্লাদিমির পুতিন, ভারত সফর, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, ভারত রাশিয়া সম্পর্ক, ভূ-রাজনীতি
